একটি জাতির পরিচয় শুধু তার ভূখণ্ড, ভাষা কিংবা পতাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একটি জাতির প্রকৃত পরিচয় তার সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনাচরণের মধ্যেই নিহিত। যে জাতি নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে যায়, সে ধীরে ধীরে নিজের শিকড় থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিদেশি বিনোদন ও ভোগবাদী জীবনধারার অবাধ বিস্তারের কারণে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অন্ধ সাংস্কৃতিক অনুকরণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ ও সামাজিক বন্ধনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিদেশি সংস্কৃতি মানেই খারাপ—এমন ধারণা সঠিক নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির সংস্কৃতি থেকে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও ইতিবাচক জীবনদর্শন গ্রহণ করা যেতে পারে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন গ্রহণের পরিবর্তে অন্ধ অনুকরণ শুরু হয়; যখন নিজের সংস্কৃতিকে তুচ্ছ মনে করে অন্যের জীবনধারাকেই আধুনিকতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দেশীয় সংস্কৃতির দুর্দিন
আজ আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি যেন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় বাংলা ভাষা, লোকগান, বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, পল্লিগীতি, গ্রামীণ মেলা, দেশীয় পোশাক ও পারিবারিক মূল্যবোধ আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব ঐতিহ্যের অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ নিজের সংস্কৃতির চেয়ে বিদেশি বিনোদন, পোশাক, ভাষা ও জীবনধারার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। আধুনিকতার নামে নিজের ঐতিহ্যকে ছোট করে দেখা এবং অন্য সংস্কৃতিকে অন্ধভাবে অনুকরণ করার প্রবণতা আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের জন্য উদ্বেগের কারণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি এখন হাতের মুঠোয়। এটি জ্ঞান ও যোগাযোগের অসাধারণ সুযোগ তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে অনুকরণের প্রবণতাও বাড়িয়েছে। অনেক তরুণ জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতায় এমন সব আচরণ ও জীবনধারাকে অনুসরণ করছে, যা আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—অনেক তরুণ নিজের ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও লোকঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। বাংলা ভাষায় কথা বলার সময় অকারণে বিদেশি শব্দের ব্যবহারকে কেউ কেউ আধুনিকতার প্রতীক মনে করছে। দেশীয় পোশাক, গান, সাহিত্য কিংবা লোকজ ঐতিহ্যকে অনেকে পুরোনো বলে এড়িয়ে যায়; অথচ বিদেশি সংস্কৃতির অনুকরণকে আধুনিকতার পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করে।
সংস্কৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তনও সম্পর্কিত। একসময় পরিবার ছিল সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ গঠনের প্রধান প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমানে অনেক পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমেছে। সেই জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদন। ফলে সন্তান কী দেখছে, কী শিখছে এবং কোন মূল্যবোধকে অনুসরণ করছে—তা অনেক সময় পরিবার জানতেও পারছে না।
তবে যুব সমাজের সব সমস্যার জন্য শুধু বিদেশি সংস্কৃতিকে দায়ী করাও সঠিক হবে না। পরিবারে সময়ের অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা, কর্মসংস্থানের সংকট, মাদক, অপরাধপ্রবণতা, সামাজিক বৈষম্য এবং অনলাইন পরিবেশ—এসবেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই সমস্যাটিকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণ। তরুণদের জোর করে কোনো সংস্কৃতি থেকে দূরে রাখার পরিবর্তে তাদের নিজের ইতিহাস, সাহিত্য, সংগীত, নাটক, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে। পরিবারকে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা তৈরি করতে হবে।
তরুণরাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের শক্তি যদি জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তারাই জাতিকে এগিয়ে নিতে পারে। আর যদি তারা আত্মপরিচয় হারিয়ে অন্ধ অনুকরণ, ভোগবাদ ও অসুস্থ বিনোদনের মধ্যে নিজেদের আটকে ফেলে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—বিদেশকে ঘৃণা করা নয়, বরং ভালোকে গ্রহণ করা এবং নিজের শিকড়কে শক্ত করে ধরে রাখা। আধুনিক হব, কিন্তু আত্মপরিচয় বিসর্জন দিয়ে নয়; বিশ্বকে জানব, কিন্তু নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে নয়।
দেশীয় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নতুন প্রজন্মের হাতে শুধু প্রযুক্তি নয়, নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যও তুলে দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে—নিজের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা মানে অন্য সংস্কৃতিকে ঘৃণা করা নয়; বরং নিজের পরিচয়কে সম্মান করা।
কারণ সংস্কৃতি হারালে শুধু কিছু গান, পোশাক বা উৎসব হারায় না—একটি জাতি তার আত্মপরিচয়ের একটি অংশ হারায়।
তাই সময় এসেছে অন্ধ অনুকরণ নয়, সচেতন গ্রহণের। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলব, পৃথিবীর ভালো জ্ঞান ও সংস্কৃতি গ্রহণ করব, কিন্তু নিজের ভাষা, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও শিকড়কে বিসর্জন দেব না।
বিশ্বের নাগরিক হব, কিন্তু নিজের শিকড়কে ভুলব না—এই হোক আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার।
লেখক:
মোঃ বদরুল ইসলাম
মুন্সী বাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ওয়েবসাইট এর কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পুর্ণ বেআইনি
Leave a Reply